আগরতলা, ২৬ অক্টোবর : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাবাকে নিয়ে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের মন্তব্যের প্রতিবাদে সারা দেশের সঙ্গে ত্রিপুরাতেও পথে নামল শাসকদল বিজেপি। সোমবার রাজধানী আগরতলায় দলের উদ্যোগে আয়োজিত হয় ধিক্কার মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে সরব হন বিজেপি-র রাজ্য নেতৃত্ব। তাঁদের দাবি, ক্ষমতার লোভে দিশাহারা হয়ে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছে।
সম্প্রতি বিহারের একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাবাকে নিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়গের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র করেছে বিজেপি। দলের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। প্রধানমন্ত্রী কিংবা শাসকদলের নীতির সমালোচনা করার অধিকার বিরোধীদের রয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনওই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিজেপি-র অভিযোগ, বিরোধীরা রাজনৈতিক বিতর্কের মান ক্রমশ নিচে নামিয়ে আনছে।
এই ইস্যুতে দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে সোমবার আগরতলায় বিক্ষোভের আয়োজন করে রাজ্য বিজেপি। রাজধানীর রবীন্দ্রভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা বিধায়ক ভগবান চন্দ্র দাস, বিধায়ক দীপক মজুমদার, বিধায়িকা মিনা রানী সরকার-সহ দলের রাজ্যস্তরের নেতৃবৃন্দ। মিছিল ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপি-র রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ভগবান চন্দ্র দাস কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস বর্তমানে রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার শিকার। ক্ষমতায় ফেরার আকাঙ্ক্ষায় দলটি দিশাহারা হয়ে পড়েছে এবং সেই কারণেই নেতারা দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করছেন। তাঁর দাবি, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করে তোলার চেষ্টা করছে কংগ্রেস।
ভগবান চন্দ্র দাস বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি-র বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনার নামে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কটাক্ষ করা রাজনৈতিক শালীনতার পরিপন্থী। তাঁর অভিযোগ, রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর মাকে নিয়ে কটাক্ষ করছেন, অন্যদিকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রীর বাবাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছেন। এই ধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস রাজনৈতিক শালীনতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করছে বলে দাবি করেন তিনি।
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করে ভগবান চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, জেএনইউ-এর দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে অস্থির করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে কংগ্রেস। তাঁর দাবি, বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। দেশের স্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিই তাঁদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিনের সমাবেশ থেকে বিরোধীদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিজেপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলের লড়াই কেবল বিজেপি কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁদের বিরোধীতা হিন্দুত্বের বিরুদ্ধেও পরিচালিত হচ্ছে। ভগবান চন্দ্র দাসের অভিযোগ, বিরোধীরা হিন্দুত্বকে ধ্বংস করতে চাইছে। পাশাপাশি দেশভাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, কংগ্রেসের পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলেই দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল।
বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত বিজেপি-র অন্যান্য নেতারাও ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁদের বক্তব্য, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বিরোধীতা স্বাভাবিক বিষয় হলেও পারস্পরিক সম্মান ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি। রাজনৈতিক বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
এদিন বিজেপি নেতৃত্ব আরও দাবি করেন, কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির এই ধরনের রাজনৈতিক আচরণের প্রভাব আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পড়বে। তাঁদের পূর্বাভাস, বিরোধীদের এই অবস্থানের কারণে নির্বাচনে তাঁরা বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়বে এবং আসনসংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আগরতলার বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সেই বিতর্কের আঁচ ত্রিপুরাতেও ছড়িয়ে পড়ল। কংগ্রেসের মন্তব্যের প্রতিবাদে বিজেপি পথে নামলেও, গোটা ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়বে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

