ধর্মনগর, ২৬ অক্টোবর : উৎসবের আলোয় শহর সাজবে, মণ্ডপে মণ্ডপে জমবে মানুষের ভিড়, আনন্দে মাতবে জনপদ। কিন্তু সেই উৎসবের আয়োজনের পর যদি খেলার মাঠজুড়ে পড়ে থাকে লোহার কাঠামো, বড় বড় গর্ত, মদের বোতল ও আবর্জনার স্তূপ, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ধর্মনগর শহরের বিবিআই ও ডিএনভি ময়দানকে ঘিরে এবার সেই প্রশ্নই ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। শারদোৎসব ও কালীপুজোকে কেন্দ্র করে এই দুই মাঠে প্যান্ডেল তৈরির অনুমতি দেওয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ, নিজস্ব পুজোর মাঠ না থাকায় শহরের কয়েকটি বড় ক্লাব এই দুই খেলার মাঠকে উৎসবের আয়োজনের জন্য ব্যবহার করছে। অথচ ধর্মনগর শহরে খেলাধুলার উপযোগী মাঠের সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। ফলে উৎসবের আয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খেলার মাঠগুলিকে ব্যবহার করা এবং পুজো শেষে সেগুলির বেহাল দশা নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুজোর অনুমতি নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলির পক্ষ থেকে মাঠ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে পুজো শেষ হওয়ার পর মাঠের চেহারা অনেক ক্ষেত্রেই বদলে যায়। মাঠজুড়ে পড়ে থাকে লোহার কাঠামো, তৈরি হয় বড় বড় গর্ত, ছড়িয়ে থাকে মদের বোতল ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা। এর ফলে সকাল-বিকেল খেলাধুলা করতে আসা শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণদেরও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ। অনেক সময় মাঠ ব্যবহারকারীদের নিজেদের উদ্যোগেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নামতে হয়। যে মাঠে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দৌড়ঝাঁপ করার কথা, যেখানে তরুণদের শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই মাঠই যদি উৎসবের পর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তাহলে মাঠের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
মুখ্যমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যুবসমাজকে নেশার কবল থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার প্রসারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। নতুন প্রজন্মকে মাঠমুখী করা, শরীরচর্চায় উৎসাহিত করা এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ধর্মনগরের মতো শহরে যেখানে খেলার মাঠের সংখ্যা সীমিত, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মাঠগুলিকে পুজোর প্যান্ডেল তৈরির কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের একাংশ।
তাঁদের বক্তব্য, খেলাধুলার মাঠ শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। মাঠের পরিবেশ নষ্ট হলে নিয়মিত অনুশীলন ব্যাহত হয়, খেলাধুলার সুযোগ কমে যায় এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাঠমুখী হওয়ার আগ্রহও ধীরে ধীরে কমতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে, তখন খেলার মাঠের সুরক্ষা ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিবিআই ও ডিএনভি ময়দানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নতুন নয়। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তৎকালীন ধর্মনগরের বিধায়ক তথা রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রয়াত বিশ্ববন্ধু সেন এই দুই মাঠে পুজোর প্যান্ডেল তৈরির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। খেলার মাঠের গুরুত্ব বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে মনে করেন এলাকার একাংশের বাসিন্দা। তাঁর সেই উদ্যোগকে ধর্মনগরের বহু মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছিলেন বলেও দাবি স্থানীয়দের।
রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি যাত্রা, নাটক ও ক্রীড়াজগতের সঙ্গে বিশ্ববন্ধু সেনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাই শহরের খেলাধুলার পরিসর অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই মনে করেন তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থনকারী বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের মতে, উৎসবের আয়োজনের জন্য বিকল্প স্থান খুঁজে বের করা সম্ভব হলেও একটি খেলার মাঠের ক্ষতি হলে তার প্রভাব পড়ে দীর্ঘদিন ধরে। সেই কারণে মাঠের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী।
কিন্তু এ বছর ফের ওই দুই মাঠে পুজোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারা এই অনুমতি দিয়েছেন, কী পরিস্থিতিতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং মাঠের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্রীড়াপ্রেমী ও অভিভাবকদের একাংশ। যদিও অনুমতি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা এ বিষয়ে তাঁদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যায়নি।
স্থানীয়দের বক্তব্য, পুজো ও আনন্দমেলা ধর্মনগরের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে মিলন, সম্প্রীতি ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু সেই উৎসবের আয়োজন করতে গিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ খেলার মাঠগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনওভাবেই কাম্য নয়। উৎসবের জন্য বিকল্প স্থান চিহ্নিত করা, প্যান্ডেল তৈরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং অনুষ্ঠান শেষে মাঠকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।
ক্রীড়াপ্রেমীদের একাংশের মতে, পুজোর অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠের ধারণক্ষমতা, মাটির অবস্থা, খেলাধুলার সময়সূচি এবং অনুষ্ঠান শেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলি বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি মাঠে লোহার কাঠামো, গর্ত কিংবা অন্যান্য বিপজ্জনক সামগ্রী ফেলে রাখা হলে তার দায়ভার কার, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শুধু অনুমতি দেওয়াই নয়, অনুমতির শর্ত যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বলে মনে করছেন তাঁরা।
ইতিমধ্যেই ধর্মনগরের বিবিআই ও ডিএনভি ময়দান থেকে পুজো এবং আনন্দমেলার আয়োজন অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি জোরালো হতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, বিষয়টি এখন আর শুধু মাঠের পরিচ্ছন্নতা বা পুজোর আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শহরের ক্রীড়া পরিকাঠামো রক্ষা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং আগামী প্রজন্মের স্বার্থের প্রশ্ন।
এই ইস্যু আগামী পুর পরিষদ নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন এলাকার একাংশের বাসিন্দা। তাঁদের মতে, খেলার মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী, তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ধর্মনগরের বিবিআই ও ডিএনভি ময়দানকে ঘিরে বিতর্ক এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে। উৎসবের আনন্দ বজায় রেখেই কীভাবে শহরের সীমিত ক্রীড়া পরিকাঠামোকে রক্ষা করা যায়, সেটাই বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক উৎসবের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া পরিসরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায়, মাঠের ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিয়ে জমে ওঠা ক্ষোভ আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের রূপ নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ধর্মনগরের খেলার মাঠগুলিকে রক্ষা করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

