টিএসআর জওয়ানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে মারধরের নালিশ

আগরতলা, ২৬ অক্টোবর : মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন, তাই তাঁকে কেউ কিছু করতে পারবে না! এমনই দাপট দেখিয়ে প্রতিবেশীদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে টিএসআর জওয়ানের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে মারধর করে রক্তাক্ত করার পাশাপাশি আক্রান্তের স্ত্রী ও মেয়েকেও শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সন্ধ্যায় ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এনসিসি থানাধীন নোয়াগাঁওয়ের মেঘলীমুড়া এলাকায়। অভিযুক্ত টিএসআর জওয়ানের নাম রাজু দেবনাথ। আক্রান্ত প্রতিবেশী দুলাল দেব ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজু দেবনাথ নোয়াগাঁওয়ের মেঘলীমুড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি ত্রিপুরা স্টেট রাইফেলসের (টিএসআর) কর্মী এবং মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ, এই পরিচয়কে সামনে রেখে তিনি প্রায় সময়ই এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁকে কেউ কিছু করতে পারবে না বলেও এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়ান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের।

অভিযোগ, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন সন্ধ্যায় রাজু দেবনাথ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে নিজের বাড়িতে আসেন। তাঁর বন্ধুদের মধ্যে একজন বাড়িতে প্রবেশের সরু রাস্তায় বাইক রেখে দেন। এর ফলে ওই রাস্তা দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নজরে আসার পর পাশের বাড়ির বাসিন্দা দুলাল দেব বাইকটি সরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজু দেবনাথের কাছে অনুরোধ জানান। আর এই সামান্য অনুরোধকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, বাইক সরানো নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রাজু দেবনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা দুলাল দেবের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উত্তেজিত হয়ে রাজু দেবনাথ দুলাল দেবের গলা চেপে ধরেন বলে অভিযোগ। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে দুলাল দেবের মাথা ফেটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং রক্তাক্ত হন তিনি।

এদিকে, চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন দুলাল দেবের স্ত্রী ও মেয়ে। অভিযোগ, তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাঁদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। রাজু দেবনাথ ও তাঁর সঙ্গীরা দুলাল দেবের মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং তাঁর স্ত্রীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আচমকা এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আক্রান্তদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন পাশের বাড়ির এক অসুস্থ ব্যক্তি। তিনি কোনওক্রমে দুলাল দেব, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে ওই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা। দুলাল দেবের পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত টিএসআর জওয়ান প্রায় সময়ই এলাকায় নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন বলে পরিচয় দিয়ে রাজু দেবনাথ এলাকাবাসীদের ভয় দেখান এবং নিজেকে কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে মনে করেন বলেও অভিযোগ।

আক্রান্ত দুলাল দেবের মেয়েও ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, সরু রাস্তা দিয়ে চলাচল করা সম্ভব হচ্ছিল না বলেই তাঁর বাবা বাইকটি সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধের জবাবে তাঁর বাবার উপর আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি বাবাকে প্রাণে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পাশের বাড়ির এক ব্যক্তি এগিয়ে না এলে তাঁদের আরও বড় বিপদের মুখে পড়তে হতো বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আক্রান্তের মেয়ে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরে রাজু দেবনাথ এলাকাবাসীদের ভয় দেখান। তবে একজন নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বাইক সরিয়ে দেওয়ার মতো একটি সাধারণ অনুরোধকে কেন্দ্র করে যদি প্রতিবেশীদের মধ্যে এমন সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তার উপর অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি সরকারি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন জওয়ান হন, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা তদন্তের বিষয়। তবে সরকারি পদ বা দায়িত্বের পরিচয় কখনওই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দিতে পারে না।

নোয়াগাঁওয়ের মেঘলীমুড়া এলাকার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আক্রান্ত পরিবারের পাশাপাশি এলাকাবাসীর একাংশও ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *