দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে তিন প্রকল্পের সুবিধা : পরিবহণমন্ত্রী

আগরতলা, ২২ সেপ্টেম্বর : সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা পৌঁছে দিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একাধিক প্রকল্প চালু রয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার বহু মানুষ এখনও এসব প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবগত নন। তাই দুর্ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রশাসনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত সকলকে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানালেন পরিবহণমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী।

মঙ্গলবার আগরতলায় সোনারতরী অতিথিশালার কনফারেন্স হলে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলাভিত্তিক ‘রোড সেইফটি অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড সেনসিটাইজেশন’ কর্মসূচির উদ্বোধন করে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে পরিবহণমন্ত্রী দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় পিএম রাহাত (ক্যাশলেস ট্রিটমেন্ট), হিট অ্যান্ড রান এবং রাহ বীর (গুড সামারিটান)—এই তিনটি প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

পরিবহণমন্ত্রী বলেন, পিএম রাহাত-এর পুরো নাম ‘প্রধানমন্ত্রী রোড অ্যাক্সিডেন্ট ভিকটিমস হসপিটালাইজেশন অ্যান্ড অ্যাসিউর ট্রিটমেন্ট’। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের নির্ধারিত হাসপাতালে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তিনি জানান, দ্বিতীয় প্রকল্পটি হল হিট অ্যান্ড রান। দুর্ঘটনার পর কোনও গাড়ি পালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা এবং আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

মন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মোটর ভেহিক্যাল অ্যাক্ট, ১৯৮৮-এর ১৬৪(বি) ধারার অধীনে কেন্দ্রীয় স্তরে এই প্রকল্প চালু করা হয়। একই বছরের ৪ এপ্রিল থেকে ত্রিপুরার সব জেলায় জেলাশাসকদের সভাপতিত্বে ছয় সদস্যের জেলা পর্যায়ের হিট অ্যান্ড রান কমিটি গঠনের মাধ্যমে রাজ্যেও প্রকল্পটি কার্যকর করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে তাঁর জীবন রক্ষায় সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে চালু করা হয়েছে রাহ বীর (গুড সামারিটান) প্রকল্প। পরিবহণমন্ত্রী জানান, কোনও ব্যক্তি দুর্ঘটনাগ্রস্তকে তাৎক্ষণিক সাহায্য করেন এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে সহযোগিতা করেন, তাহলে তাঁকে সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার এবং রাহ বীর শংসাপত্র দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাগ্রস্তকে সাহায্যকারী ব্যক্তির জন্য সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে সাহায্য করার কারণে তাঁকে অযথা আইনি জটিলতার মধ্যে পড়তে হবে না। সাধারণ মানুষ যাতে দুর্ঘটনার পর আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন এবং ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়, সেই লক্ষ্যেই ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ থেকে রাজ্যে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। আগে এই প্রকল্পটি ‘গুড সামারিটান’ নামে চালু ছিল এবং পুরস্কারের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।

পরিবহণমন্ত্রী জানান, শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় স্তরেও প্রতিবছর ১০ জন রাহ বীরকে ১ লক্ষ টাকা করে পুরস্কার এবং রাহ বীর শংসাপত্র প্রদান করা হয়। তিনি সাধারণ মানুষকে এই প্রকল্পের সুযোগ গ্রহণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময় মানবিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পরিবহণ, পুলিশ, স্বাস্থ্য দফতর এবং প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছেন। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে পশ্চিম ত্রিপুরা জিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাধিপতি বিশ্বজিৎ শীল বলেন, একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারকেও সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিধায়ক মীনারানি সরকারও উপস্থিত ছিলেন। আইজিপি (ল অ্যান্ড অর্ডার) মঞ্চাক ইপ্পার সড়ক নিরাপত্তামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে পুলিশ কর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরিবহণ দফতরের সচিব ইউ কে চাকমা সড়ক নিরাপত্তার উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রকল্পগুলির প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক ডাঃ বিশাল কুমার। সেমিনারের টেকনিক্যাল সেশনে পিএম রাহাত, হিট অ্যান্ড রান এবং রাহ বীর প্রকল্পের সুবিধা ও পরিষেবা পাওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন পরিবহণ কমিশনার সুব্রত চৌধুরী, ট্রাফিক পুলিশের এসপি কান্তা জাঙ্গিরসহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।

সেমিনারে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার তিনটি মহকুমার মহকুমা শাসক, ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান ও সদস্য, জিলা পরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের আধিকারিকরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সরকারি সহায়তা ও চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার বিষয়ে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *