আগরতলা, ২ সেপ্টেম্বর: সামনে গণেশ চতুর্থী। উৎসবকে ঘিরে রাজধানী আগরতলায় মূর্তিপাড়াগুলিতে এখন চরম ব্যস্ততা। দিন-রাত এক করে গণেশ হুম মূর্তি তৈরির কাজে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা। কোথাও চলছে শেষ মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ, কোথাও আবার দেওয়া হচ্ছে প্রাথমিক রঙের প্রলেপ। তবে উৎসবের আবহের মধ্যেও স্বস্তিতে নেই শিল্পীরা। একদিকে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা, অন্যদিকে মূর্তি তৈরির আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে দুশ্চিন্তায় মৃৎশিল্পীরা।
ক্যালেন্ডারের পাতা এগিয়ে এসেছে গণেশ চতুর্থীর দিকে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পালিত হবে গণেশ চতুর্থী। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আগরতলা শহরসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গণেশ আরাধনার প্রসার ক্রমেই বাড়ছে। ফলে গণেশ পুজোকে কেন্দ্র করে মূর্তির চাহিদাও বেড়েছে। সেই চাহিদা মেটাতে রাজধানীর বিভিন্ন মূর্তিপাড়ায় এখন দিন-রাত কাজ করছেন শিল্পীরা।
মূর্তি তৈরির শেষ পর্যায়ে এসে ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। মাটির কাজ শেষ করে মূর্তিতে প্রাথমিক রঙের প্রলেপ দেওয়া, শুকানো এবং পরবর্তী সময়ে সাজসজ্জার কাজ করতে হবে। কিন্তু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা শিল্পীদের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। কখনও রোদ, আবার কখনও বৃষ্টি—এই পরিস্থিতিতে প্রতিমা শুকানো নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে সময়মতো প্রতিমা প্রস্তুত করা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন শিল্পীরা।
এর সঙ্গে নতুন করে চিন্তা বাড়িয়েছে মূর্তি তৈরির আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর দাম। গণেশ মূর্তির সাজসজ্জার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মুকুট, অলংকার, কাপড়সহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে মূর্তি আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়। কিন্তু এসব সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় মূর্তি তৈরির খরচও অনেকটাই বেড়েছে। মৃৎশিল্পীদের দাবি, যে আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর দাম আগে ১১০ টাকা ছিল, সেটিই বর্তমানে বেড়ে প্রায় ২৫০ টাকা হয়েছে। ফলে মূর্তির দাম বাড়ানো ছাড়া কার্যত উপায় থাকছে না।
এক মৃৎশিল্পী জানান, বাড়তি খরচের তুলনায় মূর্তি বিক্রি করে লাভ খুব বেশি হচ্ছে না। তাই বর্তমানে তিনি নতুন করে বেশি অর্ডার নিচ্ছেন না। তাঁর কাছে ইতিমধ্যেই ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকারও বেশি মূল্যের গণেশ মূর্তির অর্ডার রয়েছে। পাশাপাশি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মূল্যের মূর্তিরও অর্ডার রয়েছে। তাঁর তৈরি ১৮ ইঞ্চি উচ্চতার গণেশ মূর্তি প্রায় ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ওই শিল্পীর কথায়, মূর্তির আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাও তাঁদের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। সময়মতো প্রতিমা তৈরি করে শুকিয়ে রং ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হয়। অথচ সমস্ত ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত খরচের পরও মূর্তি বিক্রি করে লাভের পরিমাণ খুবই সীমিত। সব মিলিয়ে মৃৎশিল্পীদের জীবন এখন প্রবল চাপের মধ্য দিয়ে চলছে।
শহরের আরেক মৃৎশিল্পী জানান, শুধু আনুষাঙ্গিক সামগ্রী নয়, মূর্তি তৈরির মূল উপকরণ নিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে খড়, সুতলি এবং উপযুক্ত মাটির জোগান নিয়ে সংকট রয়েছে। যেকোনও ধরনের এঁটেল মাটি দিয়ে ভালো মানের মূর্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। মূর্তি তৈরির জন্য উপযুক্ত মাটির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই মাটির জোগানও বর্তমানে পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি তাঁর।
গণেশ চতুর্থীর আগে একদিকে যেমন মূর্তিপাড়ায় উৎসবের প্রস্তুতি তুঙ্গে, তেমনই মৃৎশিল্পীদের মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। চাহিদা বাড়লেও কাঁচামাল ও আনুষাঙ্গিক সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতা তাঁদের আয়ের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। উৎসব যত এগিয়ে আসছে, ততই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মূর্তি তৈরির কাজ শেষ করার চাপে রয়েছেন রাজধানীর মৃৎশিল্পীরা।

