আগরতলা, ৭ নভেম্বর : আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে স্কাউটিং ও গাইডিং আন্দোলনের মূল্যবোধ আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শৃঙ্খলা, সহানুভূতি, দলগত কাজ, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সমাজসেবার মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় অন্যের সেবার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তাই মানুষের জীবনে আনন্দ ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত জীবনের অন্যতম সার্থক প্রচেষ্টা। শনিবার আগরতলায় লোক ভবনের দরবার হলে আয়োজিত ত্রিপুরা রাজ্য ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডসের ‘রাজ্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠান এবং সংগঠনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই অভিমত ব্যক্ত করেন রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু।
এদিন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল। অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মোট ৪৭ জন স্কাউটস ও গাইডসের হাতে ‘রাজ্য পুরস্কার’ তুলে দেন তিনি। তাঁদের এই স্বীকৃতি অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতেও সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখার আহ্বান জানান রাজ্যপাল।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল বলেন, স্কাউটিং ও গাইডিং মানেই শুধু ক্যাম্পিং, বহিরাঙ্গন কার্যক্রম কিংবা বিভিন্ন ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো তরুণ প্রজন্মের চরিত্র গঠন, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সেবার মনোভাব তৈরি করা। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ধরে রাখাও অত্যন্ত জরুরি। আর সেই কাজেই স্কাউটিং ও গাইডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
ত্রিপুরার স্কাউটস ও গাইডসদের বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন রাজ্যপাল। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাঁদের মানবিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ ও সহায়তামূলক কাজে স্কাউটস ও গাইডসরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে উল্লেখ করেন রাজ্যপাল। তাঁর মতে, এই ধরনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই তরুণদের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকৃত বিকাশ ঘটে।
এছাড়া স্বচ্ছ ভারত অভিযানের আওতায় বিভিন্ন স্কুল, বাজার এবং জনসমাগমস্থলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনায় স্কাউটস ও গাইডসদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে রক্তদান শিবির আয়োজন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, তামাকবিরোধী প্রচার এবং সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রমে তাঁদের অবদানের প্রশংসা করেন রাজ্যপাল। তিনি বলেন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই তরুণরা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদের যুক্ত করছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
অনুষ্ঠানে স্কাউটস ও গাইডস ক্যাপ্টেনদের ভূমিকাও বিশেষভাবে স্বীকার করেন রাজ্যপাল। তাঁদের নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা এবং নিরলস প্রচেষ্টার কারণেই এই আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংগঠনের এই প্রশিক্ষক ও পরিচালকদের ‘আনসাং হিরো’ বা নেপথ্যের নায়ক হিসেবে অভিহিত করে তাঁদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
‘রাজ্য পুরস্কার’-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজ্যপাল বলেন, একজন স্কাউট বা গাইডের জীবনে এই পুরস্কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি রাজ্য পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। এই সম্মান অর্জন করা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন, সমাজসেবার প্রতি অঙ্গীকার এবং স্কাউটস প্রতিজ্ঞা ও নিয়মনীতি মেনে চলার দৃঢ় মানসিকতা। বছরের পর বছর অনুশীলন, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই এই স্বীকৃতি অর্জন করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, পুরস্কারপ্রাপ্তদের এই সাফল্য শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং তাঁদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষক এবং সমগ্র স্কাউটস ও গাইডস সংগঠনের কাছেও গর্বের বিষয়। এই সম্মান আগামী দিনে আরও বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা জোগাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজ্যপালের সচিব ইউ. কে. চাকমা এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের যুগ্ম অধিকর্তা পাইমং মগ-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন কৃতী স্কাউটস ও গাইডসদের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, অন্যদিকে সংগঠনের ৭৭ বছরের পথচলা ও সমাজসেবামূলক আদর্শকেও স্মরণ করা হয়। লোক ভবন থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সংবাদ জানানো হয়েছে।

