আগরতলা, ১২ অক্টোবর : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। মণ্ডপ নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজের পর এবার রাজধানী আগরতলার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে শুরু হয়েছে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড়। মূর্তিপাড়ায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও তুলির টান। কোথাও প্রতিমার সাজসজ্জা, কোথাও রংয়ের শেষ ছোঁয়া, আবার কোথাও প্রতিমা মণ্ডপে নিয়ে যাওয়ার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহে ক্রমশ জমজমাট হয়ে উঠছে রাজধানী। এদিন আগরতলার বিভিন্ন মূর্তিপাড়া থেকে পুজোমণ্ডপে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গিয়েছে।
পিতৃপক্ষের অবসানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দেবীপক্ষের পথচলা। মহালয়ার পর থেকেই বাঙালির মনে দুর্গোৎসবের আনন্দ ও উন্মাদনা আরও বেড়েছে। হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন। আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠী। তবে কিছু পঞ্জিকায় তিথির হিসাব অনুযায়ী ১৭ অক্টোবর শনিবারও মহাষষ্ঠী পালনের উল্লেখ রয়েছে। ১৮ অক্টোবর রবিবার মহাসপ্তমী, যদিও তিথির বিশেষ বিন্যাসের কারণে কয়েকটি পঞ্জিকায় সপ্তমী দু’দিন ধরে দেখানো হয়েছে। ১৯ অক্টোবর সোমবার মহাষ্টমী ও সন্ধিপুজো এবং ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মহানবমী। পঞ্জিকাভেদে তিথির সময় ও পূজার নির্ঘন্টে পার্থক্য থাকায় সংশ্লিষ্ট পঞ্জিকা অনুযায়ী পূজার আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবেন উদ্যোক্তারা।
এদিকে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রতিটি পুজোমণ্ডপে প্রস্তুতি এখন একেবারে অন্তিম পর্যায়ে। কোথাও মণ্ডপের সাজসজ্জার কাজ চলছে, কোথাও আলোকসজ্জার চূড়ান্ত পরীক্ষা, আবার কোথাও প্রতিমা স্থাপনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত পুজো উদ্যোক্তারা। মূর্তিপাড়াগুলিতেও শিল্পী ও কারিগরদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। প্রতিমার মুখাবয়ব থেকে শুরু করে অলংকার, পোশাক ও অন্যান্য সাজসজ্জায় শেষ মুহূর্তের নিখুঁত কাজ করে চলেছেন শিল্পীরা। তাঁদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমায়।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত পঞ্জিকা অনুসারে, এ বছর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায়। মতান্তরে কিছু পঞ্জিকায় গজ বা হাতির উল্লেখ রয়েছে। দেবীর আগমন ও গমনের বাহনকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নানা পৌরাণিক ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোটকে আগমন সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে দেবীর গমন নৌকায় হলে অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা জলস্তর বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি, উর্বরতা ও পৃথিবীর শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়। অবশ্য এগুলি ধর্মীয় ও পৌরাণিক বিশ্বাসের অংশ, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়।
দুর্গাপূজা মানেই নতুন পোশাক, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মিলন, প্যান্ডেল পরিক্রমা এবং আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠা। সেই প্রস্তুতিও এখন প্রায় শেষের পথে। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ি থেকে বাজার—সর্বত্রই চলছে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা। নতুন পোশাক, জুতো, প্রসাধনী থেকে শুরু করে উপহারসামগ্রী কেনার ব্যস্ততা বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উৎসবকে ঘিরে আশার সঞ্চার হয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে জনসমাগম বাড়বে, জমে উঠবে কেনাকাটা ও উৎসবের বাজার—এমন প্রত্যাশায় রয়েছেন অনেকেই।
তবে দুর্গোৎসবের মূল আকর্ষণ প্রতিমা ও মণ্ডপের শিল্পসৌন্দর্য। শিল্পীদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল এই প্রতিমা। মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের পর থেকেই মৃৎশিল্পীর তৈরি মাটির প্রতিমা ভক্তদের কাছে দেবী দুর্গার আরাধ্য রূপে প্রতিষ্ঠিত হবে। যে প্রতিমাকে ঘিরে এতদিন ধরে শিল্পী ও কারিগরদের নিরলস পরিশ্রম, সেই প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়েই অঞ্জলি দেবেন ভক্তরা, প্রার্থনা করবেন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির।
সব মিলিয়ে ‘মা আসছেন’—এই প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিতে আসছে চূড়ান্ত গতি। ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচির গন্ধ, আলোর রোশনাই আর দেবী বন্দনার মধ্য দিয়ে আরও কয়েক দিনের মধ্যেই উৎসবের পূর্ণ রূপ ফুটে উঠবে। রাজধানী আগরতলা-সহ গোটা রাজ্য এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেবী দুর্গার আগমনের।

