হাওড়া নদীর তীরে নয়া ঠিকানা রিভারফ্রন্ট

আগরতলা, ২২ সেপ্টেম্বর : আধুনিক আগরতলার মুকুটে যুক্ত হলো আরও একটি নতুন পালক। হাওড়া নদীর তীরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল নান্দনিক ও আধুনিক হাওড়া রিভারফ্রন্ট। একসময় যেখানে নদীর তীর বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব জনপরিসর। মঙ্গলবার হাওড়া নদীর বটতলা সংলগ্ন এলাকায় হাওড়া রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাওড়া নদী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আগরতলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি জনপরিসর তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, বিনোদন, শরীরচর্চা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় ঘটেছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্টিল ব্রিজ থেকে দশমীঘাট পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ মিটার দীর্ঘ অংশকে আধুনিক রিভারফ্রন্ট হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে নদীতীরের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার জন্য গ্যাবিয়ন ওয়াল, মাইক্রো পাইল, জিও টেক্সটাইল এবং টো ওয়ালের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাঁচ বছরের অ্যানুয়াল মেইনটেন্যান্স কনট্রাক্টের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

রিভারফ্রন্টে নাগরিকদের জন্য রয়েছে ওয়াকিং পাথ, সাইকেল লেন, ভিউয়িং ডেক, এলিভেটেড ওয়াকওয়ে, ওপেন জিম, যোগা স্পেস এবং জিপলাইন। শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে প্লেগ্রাউন্ড। পাশাপাশি রয়েছে বার্ড অ্যাভিয়ারি, নেচার ট্রেইল, ফুড প্লাজা এবং আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট ভিলেজ। নিরাপত্তার জন্য গোটা এলাকায় সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য রিভারফ্রন্ট খোলা থাকবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাওড়া নদী ও তার তীর সংরক্ষণ। নদী ভাঙন ও জলাবদ্ধতার সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি এবং সুস্থ জীবনযাপনের পরিবেশ গড়ে তুলতেও রিভারফ্রন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তিনি বলেন, সরকারের তৈরি করা এই পরিকাঠামোকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা নাগরিকদেরও দায়িত্ব। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে রিভারফ্রন্ট ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য শহরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

আগরতলা স্মার্ট সিটি মিশনের আওতায় ২০১৫ সালে দেশের ১০০টি শহরের মধ্যে আগরতলা স্থান পাওয়ার পর থেকে রাজধানীর নগর পরিকাঠামো উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। আগরতলাকে স্মার্ট সিটি মিশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে রাজধানীর আধুনিক নগর উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

উদ্বোধনের আগে মুখ্যমন্ত্রী হাওড়া রিভারফ্রন্টের নবনির্মিত এলাকা পরিদর্শন করেন। প্রকল্পের বিভিন্ন পরিকাঠামো, নাগরিক সুবিধা, নদীতীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যায়নের কাজ ঘুরে দেখেন তিনি। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রকল্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার বলেন, হাওড়া রিভারফ্রন্ট শুধু একটি সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প নয়, এটি হাওড়া নদীকে সংরক্ষণ করে আগরতলা শহরের জন্য একটি নতুন জনপরিসর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় আগরতলা স্মার্ট সিটি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

মেয়র জানান, নদীতীরের ৩৭টি পরিবারকে রাধানগরে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পাকা ঘর, স্থানান্তর খরচ এবং জীবিকার সহায়তার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবনির্মিত রিভারফ্রন্টের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে হাওড়া রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের উদ্যোগে আয়োজিত রক্তদান শিবির পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য অতিথিরা। রক্তদাতাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি মানবিক এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নগরোন্নয়ন দপ্তরের সচিব ডঃ মিলিন্দ রামটেকে। উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক মিনা রানি সরকার, আগরতলা পুর নিগমের ডেপুটি মেয়র মণিকা দাস দত্ত, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব কিরণ গিত্তে, পুর নিগমের কমিশনার সাজু বাহিদ এ, আগরতলা স্মার্ট সিটি লিমিটেডের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক জি  নায়েক-সহ সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগরতলাকে আরও উন্নত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভারত, উন্নত ভারত এবং উন্নত ত্রিপুরা গড়ে তুলতে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। হাওড়া রিভারফ্রন্ট প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকেও অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান তিনি।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *