৪৫ কোটি টাকার ১৮ প্রকল্পে উনকোটির উন্নয়নে নতুন গতি, কৈলাসহর বিমানবন্দর নিয়েও আশার বার্তা

কৈলাসহর, ১৩ আগস্ট : উন্নয়নের সুফল সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক যোগাযোগ, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, কৃষি, গ্রামোন্নয়ন, নগর উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজ্য সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার ঊনকোটি জেলার কৈলাসহরের ডলুগাঁও উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ৬টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১২টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী। মোট ১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ১৮ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত উনকোটি জেলায় মোট ৫৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ১৯৭ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলি যুক্ত হওয়ায় জেলার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আরও গতি পাবে।

অনুষ্ঠানে উনকোটির পর্যটন সম্ভাবনার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন উনকোটি’ উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, জেলার ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা হচ্ছে। উনকোটি শুধু ত্রিপুরা বা ভারতের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

উনকোটির পাশাপাশি ডুম্বুর, মাতাবাড়ি, নীরমহল ও উজ্জয়ন্ত প্রাসাদসহ রাজ্যের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলিকেও আরও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। উত্তর ত্রিপুরা ও উনকোটির পর্যটন বিকাশে বিমান যোগাযোগের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কৈলাসহর বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার সহযোগিতা করবে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে পুষ্পবন্ত প্রাসাদকে ফাইভ-স্টার হোটেলে রূপান্তরের উদ্যোগের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি রাজ্যের পর্যটন শিল্প ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাজ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালে আয়োজিত ‘ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস সামিট’-এ প্রত্যাশার তুলনায় বেশি বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করেন। প্রায় ১,২০০ জন বিনিয়োগকারী সামিটে অংশ নেন এবং প্রায় ১ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে পূর্ববর্তী বিনিয়োগ প্রস্তাবের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ইতিমধ্যেই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের পরিধি রাজধানী বা কয়েকটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রতিটি জেলা, মহকুমা ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস, সবকা প্রয়াস’ মন্ত্রকে সামনে রেখে জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী ও প্রশাসন ‘টিম ত্রিপুরা’ হিসেবে একসঙ্গে কাজ করছে।

‘প্রতি ঘরে সুশাসন’ কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন শংসাপত্র, সরকারি সুবিধা ও জনকল্যাণমূলক পরিষেবা পেতে যাতে মানুষকে বারবার সরকারি দপ্তরে যেতে না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

রাজ্যের যোগাযোগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শান্তি ও সুস্থ পরিবেশের কারণে ত্রিপুরায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র মাধ্যমে যোগাযোগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে এবং ত্রিপুরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে পরিকাঠামো উন্নয়ন ও মূলধনী ব্যয়ের জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও ইতিমধ্যে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার জনমুখী প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে।

বৃষ্টির কারণে কয়েকটি এলাকায় রাস্তার কাজ ব্যাহত হয়েছে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দ্রুত রাস্তা মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজ চললে কিছু সমস্যা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কাজ থামিয়ে রাখা নয়, সমস্যার সমাধান করে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়েও এদিন বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ট্রমা সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে। উত্তর ত্রিপুরা ও উনকোটি জেলাতেও পর্যায়ক্রমে ট্রমা সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৈলাসহর হাসপাতালের পরিকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনজাতি ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য রাজ্যে ২১টি একলব্য স্কুল স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে স্মার্ট ক্লাস চালু করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, কৃষি ও কর্মসংস্থানসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ ও উন্নত করাই সরকারের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, জাতি, জনজাতি, মণিপুরী, সংখ্যালঘু-সহ সমাজের সব অংশের মানুষের সমান উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করেই শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তোলা সম্ভব। উনকোটির উন্নয়ন শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যুব বিষয়ক ও ক্রীড়ামন্ত্রী টিংকু রায় কৈলাসহর মহকুমার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ডিএম অফিস, মহকুমা অফিস, লেবার অফিস, নেশামুক্তি হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে কৈলাসহর মহকুমায় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৈলাসহর পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন চপলা রাণী দেবরায়, ত্রিপুরা স্টেট ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান মবশ্বব আলি, উনকোটি জিলা পরিষদের সদস্য বিমল কর, উনকোটি জেলার পুলিশ সুপার সহ অন্যান্য অতিথিরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উনকোটি জিলা পরিষদের সভাধিপতি অমলেন্দু দাস। স্বাগত বক্তব্য রাখেন উনকোটি জেলার জেলাশাসক মেঘা জৈন।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *