ত্রিপুরায় চিকিৎসক সংকট ও স্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কংগ্রেস বিধায়কের

প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা

আগরতলা, ২৪ জুন : এজিএমসি ও জিবিপি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং ফ্যাকাল্টিদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক ও চিকিৎসক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত সুফল মিলবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিজেপি সরকারের প্রথম প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন।

বুধবার তিনি বলেন, হাসপাতালগুলিতে কর্মসংস্কৃতি, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে শুধুমাত্র চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিলে স্বাস্থ্য পরিষেবার মানের কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না।

উল্লেখ্য, সোমবার অনুষ্ঠিত রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ (এজিএমসি) এবং জিবিপি হাসপাতালের কর্মরত সকল ফ্যাকাল্টি ও চিকিৎসক আর প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এর পরিবর্তে তাঁদের মূল বেতনের বেসিক অংশের উপর ২০ শতাংশ নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স (এনপিএ) প্রদান করা হবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সুদীপ রায় বর্মন বলেন, “চিকিৎসকরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। তারপর তাঁদের ব্যক্তিগত সময়ে কী করবেন, সেটাও কি সরকার ঠিক করে দেবে?” তাঁর মতে, শুধুমাত্র প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার মান বাড়বে—এমন ধারণার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করা হলেও অধিকাংশ চিকিৎসক মাসে অতিরিক্ত ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকার বেশি সুবিধা পাবেন না। অথচ যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন, তাঁদের আয়ের বড় অংশই বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে বহু অভিজ্ঞ চিকিৎসক স্বেচ্ছাবসর (ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট) নিয়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে পারেন।

কংগ্রেস বিধায়কের দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে একদিকে যেমন সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় চিকিৎসকের সংকট দেখা দেবে, অন্যদিকে মেডিক্যাল কলেজে ফ্যাকাল্টির সংখ্যা কমে যাওয়ায় চিকিৎসা শিক্ষাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে এমবিবিএস ও স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনায়ও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সরকারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুদীপ রায় বর্মন। তাঁর বক্তব্য, যদি জনস্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র জিবিপি হাসপাতাল ও এজিএমসিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? আইজিএম হাসপাতাল, ত্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজ (টিএমসি) কিংবা জেলা হাসপাতালগুলির ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে না কেন—সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দুরবস্থার প্রসঙ্গ তুলে প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জিবিপি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মেশিন মেরামতের নামে অনেক ক্ষেত্রে সরঞ্জাম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ক্যান্সার হাসপাতালে রেডিয়েশন মেশিন, সিটি স্ক্যান এবং সোনোগ্রাফি মেশিন চার থেকে পাঁচ মাস ধরে বিকল অবস্থায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এছাড়া ট্রমা সেন্টারের বিভিন্ন মনিটর সঠিক রিডিং দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “যেখানে রোগীর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত, সেখানে যন্ত্রপাতির নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেদিকে কোনও নজরদারি নেই।”

হাসপাতাল পরিচালনায় কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন কংগ্রেস বিধায়ক। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রকৃত উন্নতি চাইলে প্রথমে হাসপাতালগুলিতে জবাবদিহিতা, কর্মসংস্কৃতি এবং আধুনিক পরিকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করাকে তিনি ‘বাহবা কুড়ানোর সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেন।

এদিকে রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও রোগী পরিষেবা বাড়বে, আবার অনেকের আশঙ্কা এর ফলে চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *