উদয়পুর, ২৮ অক্টোবর : রাজ্যবাসীর কাছে উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ত্রিপুরা সরকার। সেই লক্ষ্যে গোমতী জেলার উদয়পুরে একযোগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্পের শিলান্যাস করা হয়েছে। ত্রিপুরাসুন্দরী মহকুমা হাসপাতালের সম্প্রসারণ, গোমতী জেলা হাসপাতালের সম্প্রসারণ এবং একটি পাবলিক হেলথ ইউনিট নির্মাণে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ১৮৯ কোটি টাকা। বুধবার উদয়পুরের ত্রিপুরাসুন্দরী মহকুমা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই তিনটি প্রকল্পের শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায়। শিলান্যাসের আগে মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী মহকুমা হাসপাতালের সম্প্রসারণ প্রকল্পের ভূমিপূজনেও অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া রাজ্যবাসীর অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মহকুমা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও রেফারেল হাসপাতালগুলিতে আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরাসুন্দরী মহকুমা হাসপাতালের সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। গোমতী জেলা হাসপাতালের সম্প্রসারণে প্রস্তাবিত ব্যয় ১৪২ কোটি টাকা। পাশাপাশি, ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে একটি পাবলিক হেলথ ইউনিট। এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের সুযোগ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার রাজ্যের সর্বত্র বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত অর্থবছরে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়েছে। দুর্গাপূজার আগে ও পরে মিলিয়ে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
উদয়পুরের গুরুত্ব তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত দিক থেকে এই শহরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। রাজ্য সরকার আগরতলা, ধর্মনগর ও উদয়পুরে স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি, উদয়পুরের সৌন্দর্যায়ন এবং নাগরিক পরিষেবার উন্নয়নেও কাজ চলছে।
তিনি বলেন, প্রসাদ প্রকল্পের অধীনে ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বছর এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে সারা দেশ থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আগমন আরও বেড়েছে। উদয়পুরে একান্ন শক্তিপীঠের প্রতিরূপ নির্মাণের কাজও চলছে। পাশাপাশি, তেপানিয়ায় আয়ুর্বেদিক কলেজ চালু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, জনমুখী প্রকল্পের বাস্তবায়ন, উন্নত নাগরিক পরিষেবার সম্প্রসারণ এবং পর্যটন পরিকাঠামোর বিকাশের মাধ্যমে আগামী দিনে উদয়পুর আরও আকর্ষণীয় শহর হিসেবে গড়ে উঠবে। অদূর ভবিষ্যতে আগরতলার পর উদয়পুর রাজ্যের অন্যতম সুন্দর শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এমবিবিএস, বিডিএস ও নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল এবং আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগরতলা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ (এজিএমসি) দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির মধ্যে বর্তমানে ১৩১তম স্থানে রয়েছে। এই অবস্থান থেকে আরও উন্নতি করে এজিএমসি ও জিবিপি হাসপাতালকে দেশের সেরা ১০টি হাসপাতালের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা, চিকিৎসা পরিষেবার মান বৃদ্ধি এবং রোগীদের আস্থা অর্জনই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বহিরাজ্যের হাসপাতালে রোগী রেফারের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। এর পাশাপাশি, চোখের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে আগরতলায় আইএলএস হাসপাতালের পাশে একটি আধুনিক চক্ষু হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ব্যয় কমাতে বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা এবং মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সুযোগের কথা উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের অধিকারকে সামনে রেখেই রাজ্য সরকার স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসার সুযোগ আরও সহজলভ্য করার মধ্য দিয়ে সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় বলেন, এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রোগীরা আরও উন্নতমানের চিকিৎসা পরিষেবা পাবেন। ত্রিপুরাসুন্দরী মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার উন্নয়নে বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সুফল পাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোমতী জেলা পরিষদের সভাধিপতি দেবল দেবরায়, উদয়পুর পুরপরিষদের চেয়ারপার্সন শীতল চন্দ্র মজুমদার, স্বাস্থ্য দফতরের সচিব কিরণ গিত্তে, গোমতী জেলার জেলাশাসক রিংকু লাথের-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

