আগরতলা, ২৪ অক্টোবর : দুর্গাপুজো শেষ, দরজায় কড়া নাড়ছে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। বাড়িতে বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন রেশন গ্রাহকদের জন্য বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি বিতরণের উদ্যোগ নিল রাজ্য সরকারের খাদ্য দফতর। শনিবার রাজধানীর প্রগতি রোড এলাকার ৬১ নম্বর সরকারি ন্যায্য মূল্যের দোকানে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সামগ্রী বিতরণ করেন খাদ্যমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী। তবে সরকারের এই উদ্যোগ ঘিরে খুশির পাশাপাশি দেখা দিয়েছে প্রশ্নও। কারণ, প্রতি বছর শারদ উৎসবের আগেই এই সামগ্রী বিতরণ করা হলেও এবার দুর্গাপুজো পেরিয়ে লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের দিন তা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সময়মতো এই সুবিধা না পাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগে ত্রিপুরার প্রায় ৯ লক্ষ ৯২ হাজার নথিভুক্ত রেশন কার্ডধারী উপকৃত হওয়ার কথা। প্রতিটি রেশন কার্ড পিছু বিনামূল্যে ২ কেজি ময়দা, ১ কেজি চিনি এবং ৫০০ গ্রাম সুজি দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারের কোষাগার থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী।
শনিবার আগরতলার প্রগতি রোড এলাকার ৬১ নম্বর সরকারি ন্যায্য মূল্যের দোকানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী নিজে রেশন গ্রাহকদের হাতে এই সামগ্রী তুলে দেন। অনুষ্ঠানে খাদ্য দফতরের অন্যান্য আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও পুজো উপলক্ষ্যে রেশন গ্রাহকদের বিনামূল্যে এই খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রাজ্যের বিপুল সংখ্যক রেশন গ্রাহকের কাছে উৎসবের সময় কিছুটা স্বস্তি পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর শারদ উৎসবকে সামনে রেখে খাদ্য দফতরের তরফে এই ধরনের বিশেষ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। সাধারণত দুর্গাপুজো শুরুর আগেই রেশন গ্রাহকদের হাতে চিনি, ময়দা ও সুজি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত সময়সূচিতে ব্যতিক্রম ঘটেছে। দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের দিন এই সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ সামনে এসেছে। ফলে সরকারের ঘোষিত সুবিধা আর বাস্তবে গ্রাহকদের হাতে সামগ্রী পৌঁছনোর সময়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড়সড় ব্যবধান।
এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন। উৎসবের জন্য বিশেষ বরাদ্দ করা খাদ্যসামগ্রী যদি উৎসবের প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পর গ্রাহকদের হাতে পৌঁছয়, তাহলে সেই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া সম্ভব? কারণ, লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতির জন্য অধিকাংশ পরিবারকে ইতিমধ্যেই বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে হয়েছে। চিনি, ময়দা ও সুজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থও খরচ হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্যের সমস্ত ন্যায্য মূল্যের দোকানে এই সামগ্রী পৌঁছে দিতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে অনেক রেশন গ্রাহকের হাতে লক্ষ্মীপুজোর আগেই এই সামগ্রী পৌঁছনো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যাঁরা সময়মতো বিনামূল্যের এই সুবিধা পাননি, তাঁদের কাছে সরকারের ঘোষণাটি আপাতত বাস্তব সুবিধার পরিবর্তে দেরিতে পাওয়া একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
বিভিন্ন মহলের বক্তব্য, সরকারের উদ্দেশ্য জনকল্যাণমূলক হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎসবকেন্দ্রিক কোনও প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে সুবিধাভোগীদের হাতে সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ, উৎসবের আগে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী পেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাজারের খরচ কিছুটা কমে। কিন্তু উৎসবের প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই সামগ্রী পৌঁছলে তার তাৎক্ষণিক উপযোগিতা অনেকটাই কমে যায়।
প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ রেশন গ্রাহকের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা উপকৃত হলেন, সেটিও বিবেচনার বিষয়। কেন এবার দুর্গাপুজোর আগে সামগ্রী বিতরণ করা সম্ভব হলো না, কেন শেষ মুহূর্তে এই উদ্যোগ কার্যকর করতে হলো এবং সমস্ত ন্যায্য মূল্যের দোকানে সামগ্রী পৌঁছতে কেন আরও সময় লাগছে—এসব প্রশ্ন ঘিরেই খাদ্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিনামূল্যে পুজোর সামগ্রী বিতরণের সরকারি উদ্যোগ একদিকে যেমন রেশন গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে সময়মতো সেই সুবিধা পৌঁছে দিতে না পারার অভিযোগও সামনে এনেছে। এখন দেখার, আগামী দিনে খাদ্য দপ্তর এই বিলম্বের কারণ স্পষ্ট করে কি না এবং ভবিষ্যতে উৎসবের আগে যাতে প্রত্যেক সুবিধাভোগীর হাতে নির্ধারিত সামগ্রী পৌঁছে যায়, তার জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

