মহালয়ায় পিতৃস্মরণ, তর্পণে মুখর হাওড়ার ঘাট—দেবীপক্ষের আগমনে উৎসবের আবহ আগরতলায়

আগরতলা, ১০ অক্টোবর  : শনিবার শুভ মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে সূচনা হলো দেবীপক্ষের। শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আসা এই বিশেষ তিথিতে রাজধানী আগরতলাসহ বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হলো মহালয়া। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি ও তৃপ্তি কামনায় এদিন সকাল থেকেই হাওড়া নদীর বিভিন্ন ঘাট এবং রাজধানীর বিভিন্ন জলাশয়ে পিতৃতর্পণ করতে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে জল ও তিল নিবেদন করে সম্পন্ন হয় চিরাচরিত ধর্মীয় পরম্পরা।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের শেষ দিনে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করলে তাঁদের আত্মার শান্তি ও তৃপ্তি লাভ হয়। সেই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই প্রতিবছর মহালয়ার পুণ্যলগ্নে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল ও তিল অর্পণ করেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। শনিবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন জলাশয় ও হাওড়া নদীর ঘাটে শুরু হয় তর্পণ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘাটে উপস্থিত হয়ে নির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি মেনে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন অনেকে। পুরোহিতদের পৌরোহিত্যে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় তর্পণের যাবতীয় আচার।

মহালয়া শুধু পিতৃতর্পণের তিথি নয়, বাঙালির কাছে এটি শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তাও বহন করে। পিতৃপক্ষের বিদায় এবং দেবীপক্ষের সূচনার এই সন্ধিক্ষণে একদিকে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের গাম্ভীর্য, অন্যদিকে মা দুর্গার আগমনকে ঘিরে আনন্দ ও প্রত্যাশা—দুইয়ের মেলবন্ধনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে মহালয়া। দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুজোকে ঘিরে মানুষের উৎসাহ ও উদ্দীপনাও আরও বাড়তে শুরু করেছে।

হাওড়া নদীর ত্রিনাথ আশ্রম সংলগ্ন ঘাটে উপস্থিত পুরোহিত অঞ্জন ঠাকুর জানান, প্রতিবছর মহালয়ার পুণ্যতিথিতে এই বিশেষ তর্পণের আয়োজন করা হয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পরম্পরার মধ্য দিয়ে মানুষ তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই আচার আজও সমান নিষ্ঠায় পালন করে চলেছেন মানুষ।

পিতৃতর্পণের তাৎপর্য বোঝাতে মহাভারতের দানবীর কর্ণের কাহিনিও বহুল প্রচলিত। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, কর্ণ জীবদ্দশায় সোনা, রুপো ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দান করেননি। মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে তিনি খাবারের পরিবর্তে সোনা ও মণিমুক্তা পান। পরে নিজের ভুল উপলব্ধি করে যমরাজের অনুমতি নিয়ে ১৬ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল নিবেদন করেন বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। এই কাহিনির সঙ্গে পিতৃপক্ষের ১৬ দিনের পরম্পরাকে যুক্ত করে দেখা হয়।

সব মিলিয়ে, শনিবার মহালয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন জলাশয় ও হাওড়া নদীর ঘাটে দেখা গেল ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় আবেগের পরিবেশ। পূর্বপুরুষদের স্মরণে জল ও তিল নিবেদনের মধ্য দিয়ে পিতৃপক্ষকে বিদায় জানালেন মানুষ। একই সঙ্গে দেবীপক্ষের সূচনায় বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হলো শারদোৎসবের প্রতীক্ষা। মহালয়ার এই পুণ্যতিথিতে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন উৎসবের আগমনী বার্তায় মুখর হয়ে উঠল রাজধানী আগরতলা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *