উদয়পুর, ১৪ জুলাই : রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে ত্রিপুরা সরকার। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত উন্নয়নের ধারাকে আরও গতিশীল করতে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সোমবার গোমতী জেলার উদয়পুরের রাজর্ষি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি গোমতী জেলার পাঁচটি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ছয়টি প্রকল্পের শিলান্যাস করে এই কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পরিকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া কোনও রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই বর্তমান সরকার নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজ্যজুড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ইতিমধ্যেই প্রায় ১২১ কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস সম্পন্ন হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মোট পাঁচটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ৭ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে উদয়পুর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ১ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ভগিনী নিবেদিতা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন, ৫ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে রমেশ ইংলিশ মিডিয়াম হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে নির্মিত সিন্থেটিক ফুটবল টার্ফ এবং ২ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে উদয়পুর এসডিএম অফিস কমপ্লেক্সে ছয়টি কর্মচারী আবাসের উদ্বোধন।
এছাড়াও তিনি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। এর মধ্যে রয়েছে ৪৩ কোটি ১৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে উদয়পুর মহকুমা হাসপাতালের নতুন চারতলা ভবন নির্মাণ, ১৪ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে হরিয়ানন্দ ইংরেজি মাধ্যম হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন, ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রামোন্নয়ন দফতরের দুটি অফিস ভবন নির্মাণ, ৪ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গোমতী যাত্রীনিবাস থেকে জাতীয় সড়ক-৮ পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়ন, ৩ কোটি ৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে শ্রম দফতরের নতুন অফিস ভবন এবং ৬ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কাকড়াবন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে সিন্থেটিক টার্ফ ফুটবল মাঠ নির্মাণ প্রকল্প।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় ত্রিপুরা সরকার উন্নয়নকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে সামনে রেখে কাজ করছে। রাজ্যের মানুষ এখন উন্নয়নের সুফল প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতে পারছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিজনেস কনক্লেভের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, প্রায় ১,২০০ জন বিনিয়োগকারী এতে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই ত্রিপুরায় শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। নীতি আয়োগের মূল্যায়নে ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের অন্যতম “ফ্রন্ট রানার” রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজ্য ইতিমধ্যেই ৩৫০টিরও বেশি জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরা দেশের তৃতীয় পূর্ণ স্বাক্ষর রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে ১০০টি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রসাদ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির এলাকাকে আধুনিক ও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে এই স্থানটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। পাশাপাশি উদয়পুরে একটি আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
রাজ্যের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের উন্নয়নযজ্ঞকে সফল করতে সমাজের সবস্তরের মানুষকে আরও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায় বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং সরকারের সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের আমলে উদয়পুরে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে, অতীতে কখনও তা হয়নি। এসময় তিনি এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরেন।
সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী টিংকু রায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিকশিত ভারত’ গঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ত্রিপুরাতেও উন্নয়নের জোয়ার বইছে। তিনি জানান, যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের উদ্যোগে উদয়পুরে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি একটি আধুনিক ইন্ডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। তিনি ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা দফতরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক অভিষেক দেবরায়, বিধায়ক জিতেন্দ্র মজুমদার, গোমতী জেলা পরিষদের সভাধিপতি দেবল দেবরায়, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব ডঃ পিকে চক্রবর্তী, স্বাস্থ্য দফতরের সচিব কিরণ গিত্যে, গোমতী জেলার পুলিশ সুপার ঋষভ, শ্রম দফতরের কমিশনার বিশ্বজিৎ পাল, বিশিষ্ট সমাজসেবী সবিতা নাথসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও জনপ্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উদয়পুর পুরপরিষদের চেয়ারম্যান শীতল চন্দ্র মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গোমতী জেলার জেলাশাসক রিংকু লাখের। এদিন মুখ্যমন্ত্রী ‘নিরাময় আরোগ্য অভিযান’-এর দ্বিতীয় পর্যায়, ‘নিরাময় ল্যাব নেটওয়ার্ক’ এবং ডায়ারিয়া নির্মূলীকরণ অভিযানেরও আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।

