আগরতলা, ৭ নভেম্বর : যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সিপিআইএম রাজ্য দফতরে পালিত হলো মহান নভেম্বর বিপ্লব দিবস। ১৯১৭ সালের রাশিয়ার ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের স্মৃতিকে স্মরণ করে শনিবার আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা তথা সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরীসহ দলের অন্যান্য নেতৃত্ব, কর্মী ও সমর্থকরা। বিপ্লবের মহান আদর্শ, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে সামনে রেখেই দিনটি পালন করেন উপস্থিত নেতৃত্ব ও কর্মীরা।
অনুষ্ঠান শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নভেম্বর বিপ্লবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন জিতেন্দ্র চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সংঘটিত নভেম্বর বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে প্রথম শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও শ্রেণির বিভেদ অতিক্রম করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং শোষণমুক্ত জীবন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, নভেম্বর বিপ্লব কেবল রাশিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না, বরং গোটা বিশ্বের শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের কাছে নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছিল। শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই বিপ্লব এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বামপন্থী আন্দোলন এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নভেম্বর বিপ্লবের আদর্শ গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধী দলনেতা বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পুঁজিবাদী শক্তিগুলি প্রচার করতে শুরু করেছিল যে সমাজতন্ত্রের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমশ সংকটের মুখে পড়ছে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নানা ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থী আন্দোলন নতুন করে শক্তিশালী হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হন জিতেন্দ্র চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে ভারতকে নয়া ফ্যাসিবাদী পথে পরিচালিত করার চেষ্টা চলছে। দেশের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার ও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক অধিকারগুলি রক্ষা করা আজ অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে সামনে রেখে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবক এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে অধিকার রক্ষার সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
বিরোধী দলনেতার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে নভেম্বর বিপ্লবের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির নানা পরিবর্তন ঘটলেও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আজও ফুরিয়ে যায়নি।
মহান নভেম্বর বিপ্লবের ঐতিহাসিক শিক্ষা ও আদর্শকে ধারণ করে মানবমুক্তির সংগ্রামকে আরও গতিশীল করার আহ্বান জানান জিতেন্দ্র চৌধুরী। একই সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণের বার্তা দেন তিনি।

