আগরতলা, ২৩ আগস্ট : ত্রিপুরা সরকার বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুলের বোঝা গ্রাহকদের উপর না চাপিয়ে ১০০ শতাংশ বহনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেও তাতে মন গলল না ত্রিপুরা ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশনের। বিদ্যুৎ মাশুলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের চার্জ, স্মার্ট মিটার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় সংক্রান্ত ব্যয় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে রবিবার সাত দফা দাবিতে গ্রাহক কনভেনশনের আয়োজন করল সংগঠনটি।
রাজধানী আগরতলায় দক্ষিণী গৃহে অনুষ্ঠিত এই কনভেনশনে গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুল প্রত্যাহার, ফিক্সড চার্জ ও ডিউটি চার্জ বাতিল, ফুয়েল অ্যান্ড পাওয়ার পারচেজ কস্ট অ্যাডজাস্টমেন্ট চার্জ প্রত্যাহার এবং স্মার্ট মিটার বাতিল-সহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হয়।
সম্প্রতি রাজ্য মন্ত্রিসভায় বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলন করে বিষয়টি ঘোষণা করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী রতনলাল নাথ। সরকারের পক্ষ থেকে বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুলের ১০০ শতাংশ বহনের সিদ্ধান্ত জানানো হলেও, এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনও বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি করেছে ত্রিপুরা ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন।
কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক সঞ্জয় চৌধুরী বলেন, সরকার বিদ্যুৎ মাশুলের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ মাশুলের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বিভিন্ন চার্জও এর আওতায় আসবে কি না, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। গ্রাহকদের উপর বিভিন্ন চার্জের বোঝা চাপিয়ে রেখে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ মাশুলে ভর্তুকি দিলে প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের কতটা সুবিধা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংগঠনের অভিযোগ, গ্রাহকদের কাছ থেকে বর্তমানে ফুয়েল অ্যান্ড পাওয়ার পারচেজ কস্ট অ্যাডজাস্টমেন্ট চার্জ নেওয়া হচ্ছে। এই চার্জের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকারকেই নেওয়ার দাবি জানানো হয় কনভেনশন থেকে। একইসঙ্গে রাজ্যের নিজস্ব জলবিদ্যুৎ ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করার দাবি জানানো হয়েছে।
সঞ্জয় চৌধুরীর বক্তব্য, রাজ্যের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করা গেলে বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমবে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ের খরচ কমানো সম্ভব হবে এবং বিদ্যুৎ মাশুল বৃদ্ধির যুক্তিও অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে বলে দাবি তাঁর।
কনভেনশন থেকে সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে বর্ধিত বিদ্যুৎ মাশুল প্রত্যাহারের পাশাপাশি ফিক্সড চার্জ, ডিউটি চার্জ এবং অন্যান্য চার্জ বাতিলের দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে স্মার্ট মিটার ব্যবস্থা বাতিলের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।
এদিন ত্রিপুরা বিদ্যুৎ নিগমের প্রশাসনিক পরিচালনার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সংগঠনের আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যুৎ নিগমের পরিচালন ব্যবস্থায় বিপুল ব্যয় হচ্ছে, অথচ এর বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের উপরই এসে পড়ছে। পাশাপাশি রাজ্যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আদায় না হওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
সঞ্জয় চৌধুরীর দাবি, প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে না। অনাদায়ী বিলের আর্থিক বোঝা পরোক্ষভাবে নিয়মিত বিল পরিশোধকারী গ্রাহকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যারা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন, তাঁদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দিয়ে অনাদায়ী বিল আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গ্রাহক সংগঠনের বক্তব্য, বিদ্যুৎ পরিষেবার প্রকৃত খরচ, উৎপাদন ব্যবস্থা, বাইরে থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়, বিভিন্ন সারচার্জ এবং নিগমের প্রশাসনিক ব্যয়—সবকিছু নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানানো হয়।
সাত দফা দাবিকে সামনে রেখে আগামী দিনে বৃহত্তর গ্রাহক আন্দোলনের ইঙ্গিতও দিয়েছে ত্রিপুরা ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন। সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বর্ধিত মাশুলের সরাসরি বোঝা বহনের ঘোষণা এলেও ফিক্সড চার্জ, ডিউটি চার্জ এবং স্মার্ট মিটারের মতো বিষয়গুলি নিয়ে গ্রাহকদের প্রশ্নের দ্রুত নিষ্পত্তি করা হোক—এটাই এদিনের কনভেনশনের মূল দাবি।

