বানভাসি বলদাখালে মাকে কোলে তুলে জল-কাদা পেরিয়ে হাসপাতালে দুই ছেলে

আগরতলা, ২৩ আগস্ট  : হঠাৎ করে হাওড়া নদীর জলস্তর বেড়ে বানভাসি বলদাখাল এলাকা। ভোরের আলো ফোটার আগেই জলের তোড়ে ডুবে যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট। চারদিকে জল আর কাদা। এই দুর্যোগের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ৭০ বছর বয়সী জনৈক বৃদ্ধা। প্রশাসনের উদ্ধারকারী দল তখনও এলাকায় পৌঁছয়নি। মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ঝুঁকি নিলেন দুই ছেলে, পুত্রবধূ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। অসুস্থ মাকে কোলে তুলে জল-কাদা পেরিয়ে তিন চাকার ঠেলায় শুইয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। পরে চন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছে অটোয় করে বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যুঞ্জয়ী এই জীবনসংগ্রামের মর্মস্পর্শী ছবি ধরা পড়েছে ক্যামেরায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উজানে ভারী বর্ষণের জেরে রবিবার রাত প্রায় তিনটে থেকেই হাওড়া নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীর জল বলদাখাল এলাকার বিস্তীর্ণ অংশে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই জলমগ্ন হয়ে যায় এলাকার পথঘাট ও একাধিক বাড়িঘর। আচমকা জলের তোড়ে এলাকায় আতঙ্ক ও কোলাহল শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে প্লাবনের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৭০ বছরের ওই বৃদ্ধা। একদিকে হু হু করে ঢুকে পড়া বানের জল, অন্যদিকে মায়ের আকস্মিক অসুস্থতা—দুইয়ের জেরে চরম উদ্বেগে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কীভাবে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো যায়, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন দুই ছেলে। তখনও প্রশাসনের নৌকা বা উদ্ধারকারী দল এলাকায় পৌঁছয়নি।

শেষ পর্যন্ত সময় নষ্ট না করে মাকে কোলে তুলে নেন দুই ছেলে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহায়তায় জল-কাদা ভেঙে তাঁকে একটি তিন চাকার ঠেলায় তোলা হয়। এরপর জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে ঠেলাটি ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকেন তাঁরা। কোথাও বুকসমান জল, কোথাও কাদা—সব বাধা পেরিয়ে চন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছনোর পর অটোয় করে অসুস্থ বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে, প্লাবিত বলদাখাল এলাকায় প্রশাসনের উদ্ধারকারী দলের তৎপরতাও শুরু হয়। স্থানীয়দের দাবি, এদিন একটি পরিবারের মাত্র তিন দিনের শিশুকেও উদ্ধার করে নিরাপদে শেল্টার হাউসে পৌঁছে দেন উদ্ধারকারীরা। পাশাপাশি জলমগ্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েকটি পরিবারের গবাদি পশুও উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধারকাজে হাত লাগান।

বলদাখাল এলাকা শহরের অন্যতম নিম্নাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই হাওড়া নদীর জল উপচে পড়ে এই এলাকায় প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীর জল বাড়ার অভিজ্ঞতা এলাকাবাসীর কাছে নতুন নয়। তবে রবিবারের প্লাবনের তীব্রতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের বক্তব্য, রাত তিনটে নাগাদ জল বাড়তে শুরু করার পর মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যেই এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত জলের তলায় চলে যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় সকাল ছয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত। দীর্ঘ প্রায় সাত ঘণ্টা হাওড়া নদীর জলস্তর একই উচ্চতায় অবস্থান করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় নদীর জলস্তর ছিল ১০.৮৬ মিটার, যা বিপদসীমার অনেকটাই ওপরে। ফলে বলদাখাল-সহ নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে।

একদিকে ঘরবাড়ি জলের তলায়, অন্যদিকে অসুস্থ স্বজনকে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা—রবিবারের এই দৃশ্য ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষের অসহায়তা ও পরিবারের প্রতি মানুষের অদম্য দায়বদ্ধতার ছবি।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *