আগরতলা, ১ জুলাই : ত্রিপুরার জাতীয় সড়ক পরিকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন, চলমান প্রকল্পগুলির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বুধবার নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও জাতীয় সড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করির সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। দীর্ঘ বৈঠকে রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, চলমান জাতীয় সড়ক প্রকল্পগুলির কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি সড়কগুলির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে রাজ্যের অভ্যন্তরে এবং অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে নতুন প্রকল্পও হাতে নেওয়া হবে।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০১৪ সালে ত্রিপুরায় জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১৯৮ কিলোমিটার। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে বর্তমানে তা বেড়ে ২০২৬ সালে ৯২৩ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। এছাড়া বহু প্রতীক্ষিত আগরতলা রিং রোড প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়করিকে ধন্যবাদ জানান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে রয়েছে চূড়াইবাড়ি থেকে চম্পকনগর পর্যন্ত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার জাতীয় সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা। রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এই প্রকল্পের এলাইনমেন্ট অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও জাতীয় সড়ক মন্ত্রক। নতুন গ্রিনফিল্ড চার লেন সড়কটি রেলপথের সমান্তরালভাবে নির্মিত হবে। আঠারমুড়া ও লংতরাই পাহাড়ি এলাকায় দুটি টানেল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। খুব শীঘ্রই এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে।
রানিরবাজার থেকে চন্দ্রপুর আইএসবিটি পর্যন্ত জাতীয় সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য রাজ্য সরকারকে মোট প্রয়োজনীয় জমির ৯০ শতাংশ হস্তান্তর করতে হবে এবং আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ, পানীয় জল, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন পরিকাঠামোগত পরিষেবার স্থানান্তরের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এরপরই এনএইচআইডিসিএল প্রকল্পটির জন্য দরপত্র আহ্বান করবে।
আগরতলা থেকে উদয়পুর পর্যন্ত জাতীয় সড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) তৈরির কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে রাস্তার এলাইনমেন্ট চূড়ান্ত করা হবে এবং এরপর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে উদয়পুর থেকে অমরপুর পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার সড়ককেও জাতীয় সড়কের মানে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সড়কটি জাতীয় সড়ক-৮ এবং জাতীয় সড়ক-২০৮-কে সংযুক্ত করবে। পাশাপাশি ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির, ছবিমুড়া এবং ডম্বুর লেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলির সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে কমলপুর–আমবাসা–গণ্ডাছড়া–শান্তিরবাজার পর্যন্ত ১৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পও অনুমোদনের পথে এগিয়েছে। পর্যটন, বাণিজ্য এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই এই সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আগরতলা শহরের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়েস্টার্ন বাইপাস নির্মাণের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই প্রকল্পে সার্ভিস লেনের সুবিধাও যুক্ত করা হবে। অন্যদিকে, এলাইনমেন্ট ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে লেম্বুছড়া থেকে খয়েরপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণের কাজও শুরু হবে।
রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত জাতীয় সড়কের পুনর্নির্মাণ নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আগরতলা–খোয়াই (এনএইচ-১০৮বি), কুমারঘাট–কৈলাসহর, কৈলাসহর–খোয়াই (এনএইচ-২০৮) এবং কৈলাসহর–কুর্তি ব্রিজ (এনএইচ-২০৮এ) সড়কের উপরিভাগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেন্ট্রাল রোড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সুপারিশ অনুযায়ী এগুলির পুনর্নির্মাণ করা হবে। এছাড়া কুর্তি ব্রিজ থেকে চাঁদখিরা পর্যন্ত এনএইচ-২০৮এ সড়কের প্রস্থ ৭ মিটার থেকে ১০ মিটারে উন্নীত করার বিষয়ে অসম সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান, জাতীয় সড়কের পাশে প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে বর্ষাকালে রাস্তার পাশের বসতিগুলি জলমগ্ন না হয় এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি কমানো যায়।
রাজ্য সরকারও সমস্ত প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে সময়মতো জমি অধিগ্রহণ, বন দফতরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং বিভিন্ন পরিকাঠামোগত পরিষেবার স্থানান্তরের বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বৈঠকে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রকের সচিব ভি. উমাশংকর, পূর্ত দফতরের সচিব কিরণ গিতো, এনএইচআইডিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পূর্ত দফতরের (জাতীয় সড়ক) মুখ্য বাস্তুকার সুব্রত বণিকসহ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।

