আগরতলা, ১৬ আগস্ট।। রক্তদান কেবল একটি শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা এটি মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ও মানবিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন। রক্তের কোনো বিকল্প নেই। তাই সুস্থ সমাজ গঠনে যুবসমাজ ও ক্লাবগুলিকে আরও বেশি করে সামাজিক কাজে এগিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে যুবসমাজকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সকলকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আজ আগরতলার রামনগর এলাকায় মুক্তিসঙ্ঘ ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত রক্তদান শিবিরের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একসময় ক্লাবগুলিকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বিবাদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ছবি দেখা যেত। বর্তমানে সেই সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ক্লাবগুলি এখন সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়ে রক্তদান, সমাজসেবা, শিক্ষা, ক্রীড়া ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার এই ইতিবাচক ক্লাব সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজ্যে রক্তদান কর্মসূচিগুলিতে মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার মানুষের সেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। সেই সেবার মানসিকতাকে সামনে রেখে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে জনকল্যাণমূলক কাজে এগিয়ে আসতে হবে। রক্তদান সেই সেবারই একটি মহান দৃষ্টান্ত। আজকাল বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষ দলগতভাবে রক্তদানে এগিয়ে আসছেন। মানুষের এই মানবিক উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করছে। যুবসমাজের এই ইতিবাচক ভূমিকা আগামী দিনে একটি সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার মানুষের কল্যাণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং পরিকাঠামো সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রিপুরা এগিয়ে চলেছে। নীতি আয়োগের বিভিন্ন মূল্যায়নে ত্রিপুরা ‘ফ্রন্ট রানার স্টেট’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম সেরা রাজ্য হিসেবে উঠে এসেছে। পঞ্চায়েত ক্ষেত্রেও রাজ্য একাধিক জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে। রাজ্যের মানুষের মাথাপিছু আয়ও জাতীয় গড়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যেই এখন বহু জটিল রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য রাজ্যের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে এবং রোগী রেফার করার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। জিবি হাসপাতালে রোগীর পরিজনদের জন্য মাত্র ১০ টাকায় খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রেও সরকার সহযোগিতা করছে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগরতলা শহরের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে আগে যেখানে বৃষ্টির পর দীর্ঘসময় জল জমে থাকত, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই অল্প সময়ের মধ্যে জল নেমে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্রোন ও অত্যাধুনিক ক্যামেরার মতো প্রযুক্তিও কাজে লাগানো হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নেশার বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে কাজ করছে। যুবসমাজকে নেশা থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করতে হবে। সুস্থ শরীর ও সুস্থ মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবার, ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনগুলিরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিবারের ছেলে-মেয়েদেরও জনসেবার কাজে এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। রাজনীতি কোনো বিশেষ পরিবারের সম্পত্তি নয়, মানুষের সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার বলেন, বর্তমানে রাজ্যে রক্তদান কর্মসূচিগুলিতে মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্লাব সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং ক্লাবগুলির সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক বেড়েছে। মানুষ দলগতভাবে রক্তদানে এগিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, রক্তদান মানবতার চূড়ান্ত নিদর্শন এবং এর কোনো বিকল্প নেই। সকলকে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। মেয়র আরও বলেন, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রিপুরা এগিয়ে চলেছে। সরকারের সার্বিক উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিশ্বাস’-এর আদর্শকে সামনে রেখে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুক্তিসঙ্ঘ ক্লাবের সম্পাদক। বক্তব্য রাখেন সমাজসেবী শ্যামল কুমার দেব। উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবী শেখর দত্ত সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিন মুখ্যমন্ত্রী বিধায়ক উন্নয়ন তহবিল থেকে মুক্তিসঙ্ঘ ক্লাবকে একটি শববাহী যান প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে আগরতলা পুরনিগমের অন্তর্গত ‘সবুজ সাথী’দের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের এবং শিক্ষা ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারীদের সংবর্ধনা জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা সহ উপস্থিত অতিথিরা তাঁদের সংবর্ধিত করেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে মুখ্যমন্ত্রী রক্তদান শিবির পরিদর্শন করেন এবং রক্তদাতাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের উৎসাহিত করেন। শিবিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করেন বহু মানুষ।
এছাড়া রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ডাঃ) মানিক সাহা আজ উত্তর বাধারঘাটের ভট্টপুকুর বাপুজি স্কুল রোড সংলগ্ন নব ঐক্য ক্লাবের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে আয়োজিত স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির ও মেগা স্বাস্থ্য শিবিরেরও উদ্বোধন করেন তিনি। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী অসীম ভট্টাচার্য, আগরতলা পুর নিগমের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেয়র-ইন-কাউন্সিলর বাপ্পি দাস, টিআরটিসি’র বোর্ড অফ ডিরেক্টর শ্যামল কুমার দেব, আগরতলা পুর নিগমের সাউথ জোনাল চেয়ারম্যান অভিজিৎ মল্লিক, নব ঐক্য ক্লাবের সভাপতি-সম্পাদকসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সমাজের সার্বিক উন্নয়নে ক্লাবগুলিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান সময়ে যুব সমাজের ক্লাবমুখী হওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে গেলেও নতুন প্রজন্মকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, একটি ক্লাব শুধুমাত্র খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয় বরং এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাস্তা, পানীয় জল, পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ক্লাব যত বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে, ততই এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস এবং সবকা প্রয়াস” মন্ত্রের উল্লেখ করে সকলকে সঙ্গে নিয়ে সমাজ গঠনের আহ্বান জানান।
পাশাপাশি ইতিবাচক চিন্তাধারা ও সমাজসেবামূলক মানসিকতার মানুষদের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রক্তদান শিবির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মানবসেবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো রক্তদান। একইসঙ্গে সমাজে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নব ঐক্য ক্লাবের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে গৃহীত উদ্যোগের প্রশংসা করে ভবিষ্যতে খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা, বস্ত্র বিতরণ, শিক্ষাসামগ্রী প্রদানসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী রক্তদান শিবির পরিদর্শন করেন এবং রক্তদাতাদের উৎসাহিত করেন। এদিনের স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরে প্রায় ৩০ জন রক্তদাতা রক্তদান করেন। পাশাপাশি আয়োজিত মেগা স্বাস্থ্য শিবিরে এলাকার দুই শতাধিক নাগরিক স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণ করেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় ওষুধও বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন নব ঐক্য ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ কানু দেব। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদ অসীম ভট্টাচার্য। সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে নব ঐক্য ক্লাবের এই উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং সামাজিক উন্নয়ন ও মানবসেবামূলক কার্যক্রমে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

