মমতার শাসনে সরকারি দরপত্র কেলেঙ্কারি: ১৫০ কোটি টাকার দুর্নীতিতে নাম ইন্দ্রনীলের

কলকাতা, ৭ নভেম্বর : দুর্গাপূজার ভিআইপি পাস বেআইনিভাবে বিক্রির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর এবার সরকারি দরপত্রে (টেন্ডার) কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির জালে জড়ালেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন দফতরের মন্ত্রী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাত্র তিনটি সংস্থাকে পাইকারি হারে সরকারি কাজের বরাত দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাতে এসেছে তদন্তকারীদের। প্রাথমিক তদন্তে এই কেলেঙ্কারির আর্থিক পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের।
তদন্তে উঠে আসা নথিপত্র পরীক্ষা করে গোয়েন্দারা দেখেছেন, কলকাতায় একাধিক প্রথম সারির যোগ্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন দফতরের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজের টেন্ডার কেবল ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট তিনটি সংস্থার ঝুলিতেই গিয়েছে।
তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পুজোর সরকারি কাজে অংশ নিয়েছিল ঠিক ওই তিনটি সংস্থাই। সেখানে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে একটি সংস্থাকে বাতিল দেখিয়ে অন্যটিকে চার লক্ষ ৪৫ হাজার টাকার চুক্তি দেওয়া হয়। এরপর ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে রাজ্য দিবসের অনুষ্ঠানেও দরপত্র জমা দেয় সেই একই তিনটি সংস্থা এবং একটি সংস্থা পায় ৪৫ লক্ষ টাকার কাজ। একইভাবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বরিশা পৌষ উৎসবে চন্দননগরের কাজে বাতিল হওয়া সংস্থাকেই পাইয়ে দেওয়া হয় ৩৯ লক্ষ টাকার বরাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিষ্ণুপুর সঙ্গীত উৎসবের ক্ষেত্রেও একই সিন্ডিকেটের আধিপত্য বজায় ছিল এবং ৮৫ লক্ষ টাকার টেন্ডার জিতে নেয় সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা।
টানা নয় বছর তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রনীল সেন এবং বিগত তিন বছর তিনি পর্যটন দফতরের দায়িত্বও সামলান। তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, কাগজপত্রে প্রাক্তন মন্ত্রী এই সংস্থাগুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও, গ্রেফতার হওয়া ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে ‘শুভ’, তাঁর সংস্থা ‘মাস আর্ট’ এবং মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই তিনটি সংস্থার প্রত্যক্ষ আর্থিক লেনদেনের বহু অকাট্য তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
দরপত্রের নথি অনুযায়ী, রাজডাঙার প্রথম সংস্থাটি তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকে প্রায় ৬০ কোটি এবং পর্যটন দফতর থেকে ৪ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। হাজরা রোডের দ্বিতীয় সংস্থাটি দুই দফতর মিলিয়ে পেয়েছে যথাক্রমে ৬১ কোটি ও ৫ কোটি টাকার বরাত। অন্যদিকে দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের তৃতীয় সংস্থাটি তথ্য ও সংস্কৃতি থেকে ২০ কোটি এবং পর্যটন থেকে প্রায় ১ কোটি টাকার বরাত পায়। এই বিশাল আর্থিক গরমিলের সূত্র ধরে পুলিশ এখনও পর্যন্ত ২৮টি সন্দেহজনক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন সম্পূর্ণ ফ্রিজ করে দিয়েছে।
শুক্রবার কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিডি) কসবায় ইন্দ্রনীল সেনের বাসভবনে দীর্ঘ তল্লাশি অভিযান চালায়। তদন্তকারীদের অনুমান, বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দর দেখিয়ে এই টেন্ডারগুলি বণ্টন করায় দুর্নীতির প্রকৃত অঙ্ক ১৫০ কোটি টাকার অনেকটাই বেশি হতে পারে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুই দফতরের পদস্থ আধিকারিকদের যোগসাজশও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, পুলিশের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদে প্রাক্তন মন্ত্রীর মেয়ে দাবি করেছেন, তাঁর সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির যাবতীয় কাজকর্ম তাঁর বাবাই তদারকি করতেন এবং সেখানে আসা অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল নন। অন্যদিকে, প্রশাসনিক পদের চরম অপব্যবহার করে দুর্নীতির অভিযোগে লালবাজারের তরফে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে এবার দুর্নীতি দমন আইনের কড়া ধারা যুক্ত করার আইনি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *