ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে একসঙ্গে বিজেপি-টিপ্রা মোথা-আইপিএফটি

আগরতলা, ৫ সেপ্টেম্বর : সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে আসন্ন ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিল বিজেপি, তিপ্রা মথা ও আইপিএফটি। তিন দলই একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবে নির্বাচনে যৌথভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে শনিবার আগরতলায় ফিরে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। পাশাপাশি ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির বিভিন্ন বিষয় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও ভিলেজ কমিটি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। অমিত শাহের সরকারি বাসভবনে প্রায় ৯০ মিনিট ধরে বৈঠক চলে। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ সাহা ছাড়াও তিপ্রা মথার সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মন এবং বিজেপি-র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমন্বয়কারী সম্বিত পাত্র উপস্থিত ছিলেন।

শনিবার আগরতলায় ফিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বৈঠকে মূলত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথমত, আসন্ন ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে তিন শরিক দলের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা ও আসন ভাগাভাগি। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তির বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও বিষয় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া।

ডাঃ সাহা বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে বিজেপি, আইপিএফটি এবং তিপ্রা মথা আসন্ন ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবে একসঙ্গে লড়াই করবে। তিন দলের মধ্যে জোট অটুট থাকবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। নির্বাচনে আসন সমঝোতা ও প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ইতিমধ্যেই দল গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই একসঙ্গে লড়ব।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি ও তিপ্রা মথার মধ্যে সাম্প্রতিক দূরত্ব কমিয়ে ফের সমন্বয়ের পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভিলেজ কমিটি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আগামী মাস থেকেই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চুক্তি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনের পর আমরা এই চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো সমাধান করব। চুক্তিসংক্রান্ত সমস্ত বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে।” তাঁর দাবি, এ বিষয়ে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে এবং বৈঠকে উপস্থিত সব নেতাই আলোচনার ফলাফলে সন্তুষ্ট।

ডাঃ সাহা বলেন, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনও একটি সম্প্রদায়ের স্বার্থকে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হবে না। রাজ্যের সমস্ত সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই চুক্তির বিষয়গুলি বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন, “ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা যা-ই করি না কেন, কোনও একক সম্প্রদায় কোনও বৈষম্যের শিকার হবে না। সকল সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।”

এদিকে আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি সংগঠনগুলির ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধ নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়। প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্বল ভূমিকা পালন করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সরাসরি নাকচ করে দেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “প্রশাসন যেকোনো সময় কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু এভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় না। সবকিছুরই একটা সীমা আছে। কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিপ্রা মথার দীর্ঘদিনের ভূমি অধিকার-সহ বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে বলে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী কোনও মন্তব্য করেননি। ফলে চুক্তির কোন কোন বিষয় কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব গত কয়েক বছর ধরে তিপ্রা মথার অভ্যন্তরে অসন্তোষের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় আড়াই বছর পরও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় দলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির বৈঠক এবং আসন্ন ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে তিন দলের একসঙ্গে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত ত্রিপুরার রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে ২০২৬ সালের টিটিএএডিসি নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ওই নির্বাচনে তিপ্রা মথা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৮টি আসনের মধ্যে ২৪টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে বিজেপি চারটি আসনে জয় পায়। নির্বাচনের পর বিজেপি ও তিপ্রা মথার সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি, তিপ্রা মথা ও আইপিএফটি-র যৌথভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে নির্বাচনী সমীকরণে তিন দলের শক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ—দুই বিষয়ই আগামী দিনে ত্রিপুরার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *