নির্ধারিত সময়েই শেষ করতে হবে উন্নয়ন প্রকল্প, দিশা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা

আগরতলা, ১৮ আগস্ট।। উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং এর সুফল সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আজ সচিবালয়ের ২ নং কনফারেন্স হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজ্যস্তরের দিশা কমিটির বৈঠকে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। তিনি দিশা কমিটির আগের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির অধিকাংশই সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনার মাধ্যমে কাজের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায় এবং পারস্পরিক দূরত্ব কমে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রশাসনকে সব সময় সংবেদনশীল হয়ে কাজ করতে হবে। গত বৈঠকে যেসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যালোচনা সভা করার নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের অধিকাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি বর্তমানে জাতীয় গড়ের সমতুল্য। তবে এই সাফল্যে আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছে দিতে হবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা তৈরী করতে হবে।

দিশা কমিটির বৈঠকে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার এর সুবিধা যাতে মানুষ সহজে পান, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পগুলির কভারেজ প্রায় ১০০ শতাংশ হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকল্পগুলির সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন কোন রোগের চিকিৎসা ও সার্জারি এই প্রকল্পগুলির আওতায় রয়েছে, তা সহজভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরার উপর গুরুত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে তিনি হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনীয় তথ্যের তালিকা প্রদর্শনের পাশাপাশি কিউআর কোড ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এই ব্যবস্থা চালু হলে রোগী বা তার পরিজন মোবাইলে স্ক্যান করে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে কার্ডের মাধ্যমে কোন কোন চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যাবে তা সহজেই জানতে পারবেন। বৈঠকে স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক জানান, বর্তমানে এবি-পিএমজেএওয়াই-এর আওতায় রাজ্যে ১৬,৬৬,৮৭০টি আয়ুষ্মান কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং ৭,০০,৯২২টি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে। একইভাবে মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা এর আওতায় ৬.৩৬,৫২৭টি কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং ২,৮৬,৮২০টি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে।

দিশা কমিটির বৈঠকে সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেসব অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা ভালো নয়, সেগুলি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এখনও নিজস্ব জমিতে নেই, সেগুলিকে ধাপে ধাপে নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাজ্যে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা মডেল অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিকে মানদণ্ড হিসেবে সামনে রেখে ধাপে ধাপে সব অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। বাল্যবিবাহ রোধের বিষয়েও বৈঠকে বিশেষ ভাবে আলোচনা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সমাজের সকল স্তরের মধ্যে সচেতনতা আরও বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেন।

টিআরএলএম-এর মাধ্যমে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনে আরও বেশি করে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বচ্ছ ভারত মিশনের সাফল্য শুধু গ্রাম বা সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অফিসগুলিতেও এর ভাবনা আরও কার্যকরভাবে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি অফিসগুলিতে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে সকলকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকের শুরুতে বিদ্যুৎ দপ্তরের সচিব অভিষেক সিং বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে রূপায়িত কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির অগ্রগতি ও সাফল্যের তথ্য মুখ্যমন্ত্রীকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও বাণিজ্য, পূর্ত, কৃষি, বন, জাতীয় সড়ক এবং সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা-সহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান সচিব, সচিব ও অধিকর্তারাগণ তাঁদের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় প্রকল্পসমূহ সহ দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়ন ও সাফল্যের তথ্য তুলে ধরেন। বৈঠকে গ্রামন্নয়ন, আবাসন, পানীয় জল, স্বচ্ছ ভারত মিশন, নগর উন্নয়ন, শিক্ষা, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি দপ্তরের প্রকল্পগুলির অগ্রগতির বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক জানান, পিএমএওয়াই-জি এর আওতায় রাজ্যে অনুমোদিত ৩.৭৬ লক্ষ বাড়ির মধ্যে ৯৯ শতাংশের নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি জল জীবন মিশনের আওতায় ৬,২৪,৪৭৭টি গ্রামীণ পরিবারে পানীয় জলের সংযোগ (এফএইচটিসি) দেওয়া হয়েছে। যা রাজ্যের গ্রামীণ পরিবারগুলির ৮৩.১৭ শতাংশ। স্বচ্ছ ভারত মিশন-গ্রামীণের ক্ষেত্রেও রাজ্যের অগ্রগতির কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়। যেখানে সফলতা অর্জনকারী রাজ্যগুলির মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম। কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং ই-এনএএম এর মাধ্যমে কৃষকদের বাজার সংযোগ বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অগ্রগতি বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। পিএমজিএসওয়াই সহ জাতীয় সড়কগুলির নির্মান কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা এবং মাঠপর্যায়ে কোনও সমস্যা থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা নির্দেশ দেন।

আজ বৈঠকে মুখ্যসচিব জে কে সিনহা বলেন, দিশা কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির রূপায়নের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পগুলির কাজের গতি, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্যের প্রতিটি দপ্তর প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। কেন্দ্রীয় সরকার যখন বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে, তখন ত্রিপুরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করছে। এটি রাজ্যের প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, বৈঠকে জনপ্রতিনিধিগণ যে সব গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন এবং যেসব সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, সেগুলিকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৈঠকে সাংসদ কৃতি দেবী দেববর্মা, অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী কিশোর বর্মন, বিধায়ক মনোজ কান্তি দেব, বিধায়ক অন্তরা দেব সরকার, বিধায়ক বীরজিৎ সিনহা, বিধায়ক শৈলেন্দ্র চন্দ্র নাথ-সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিগণ উপস্থিত থেকে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। বৈঠকের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রকল্পের সুফল দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, মাঠপর্যায়ের সমস্যার সমাধান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *